আবু নাসের আহমেদ রাজিব
প্রিন্ট
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট : ৩:০৫ অপরাহ্ণ
![]()
পুরস্কার বিতরণের প্রাক্কালে কথা বলেন হিলারি ক্লিনটন। ছবি-সংগ্রহ।
আবু নাসের রাজিব
পুরস্কার, পৃষ্ঠপোষকতা আর স্বার্থের সংঘাত: কী চমৎকার এক সমীকরণ!
নোবেলজয়ী। ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ। আর এখন হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী। কী অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার! ধীরে ধীরে পুরো বিষয়টা দেখি, যাতে কেউ গুলিয়ে না ফেলেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য আরো কয়েকটি দেশের সংবাদপত্রে খবর ছাপা হয় যে, হিলারি ক্লিনটন যখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তখন ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে অনুদান দিয়েছিল। ইউনূস যে গ্রামীণ আমেরিকার চেয়ারম্যান, সেই প্রতিষ্ঠান ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে ১ লাখ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দিয়েছে। গ্রামীণ রিসার্চও দিয়েছে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার। গ্রামীণের মুখপাত্র অবশ্য তখন বলেছিলেন যে, ওই টাকা ছিল Clinton Global Initiative (CGI) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার বার্ষিক ফি ও সদস্য ফি।
হিলারি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তখন ইউনূস তাঁর সঙ্গে তিনবার দেখা করেন। শেখ হাসিনার সরকার যখন তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানোর চাপ দিচ্ছিল, তখন তিনি হিলারির কাছে সাহায্য চান। তিনি লিখেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের বিষয়টি যেন “বন্ধুত্বপূর্ণভাবে” তোলা হয়, আর শেষে লিখেছিলেন “regards to H”। হিলারি তাঁর সহকারীদের বলেছিলেন সাহায্যের উপায় খুঁজে বের করতে। পরে ঢাকায় গিয়ে তিনি প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের কাজে যেন কোনো হস্তক্ষেপ না হয়। প্রায় একই সময়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের অধীন USAID তাঁর সময়কালে গ্রামীণ ফাউন্ডেশনকে ২২ লাখ ডলার দিয়েছে।
হিলারি ক্লিনটনের নামে পুরস্কার পেলেন ইউনুস। এখন প্রশ্ন হলো, এই পুরস্কার কি নিছক যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, পারস্পরিক আনুকূল্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতার এক মধুর পরিণতি?
প্রশ্নটা ইউনূস পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য কি না, শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো, পুরস্কারদাতার সঙ্গে পুরস্কারপ্রাপকের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকলে সেই পুরস্কারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?
স্বার্থের সংঘাত প্রমাণিত দুর্নীতির সমার্থক নয়। কিন্তু স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যদি সবাই ভান করেন যে এখানে প্রশ্ন করার কিছুই নেই, তাহলে সেটি নৈতিকতার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি আনুগত্যই বেশি প্রকাশ করে।
নীতির কথা বলা সহজ। নিরপেক্ষতার প্রমাণ দেওয়াই আসল পরীক্ষা।
ব্যাপারটা বেশ চমৎকার! আপনি অনুদান দেবেন, আপনার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা সরকারি অর্থ পাবে, আর একদিন সেই সম্পর্কের অন্য প্রান্ত থেকে আপনি সম্মাননাও পেয়ে যাবেন। সবকিছুই হয়তো নিয়মমাফিক। হয়তো পুরোটাই যোগ্যতার প্রতিদান। হয়তো টাকা, সাক্ষাৎ, সাহায্য আর ট্রফি, সব আকাশের গ্রহের মতো নিজে থেকেই সারিবদ্ধ হয়ে গেছে। মহাবিশ্ব তো উদার।
পুরস্কার হাতে মুহম্মদ ইউনূস। ছবি-সংগ্রহ।
ফেসবুকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন পুরস্কার পেয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বাংলাদেশি মুহাম্মদ ইউনূস।
বৃহস্পতিবার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাসটন হলে এক আয়োজনে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
শুক্রবার ফেইসবুক পাতায় প্রকাশ করা এক বিজ্ঞপ্তিতে ওই পুরস্কার বিরতণী আয়োজনের তথ্য তুলে ধরেছে ইউনূস সেন্টার।
হিলারি ক্লিনটন এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি (জিআিইডব্লিউপিএস) যৌথভাবে এই পুরস্কার দিয়ে থাকে।
এবারের আয়োজনে মোট চারজনকে পুরস্কৃত করা হয়। ইউনূসের সঙ্গে হিলারি ক্লিনটন পুরস্কার পেয়েছেন ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেন’স অ্যাসোসিয়েশনের (এসইডব্লিউএ) পরিচালক রিমা নানাবাতি এবং ফ্যাশন ডিজাইনার টরি বার্শ।
তাদের সঙ্গে জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান পেয়েছেন জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি অ্যাম্বাসেডর্স অ্যাওয়ার্ড।
ইউনূস সেন্টার বলেছে, অনুষ্ঠানে প্রায় চারশ অতিথির মধ্যে ছিলেন প্রায় ২৫ দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক।
ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত পর্যায়ে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে। হিলারি ক্লিনটন ১৯৯৫ সালে তার মেয়ে চেলসি ক্লিনটনকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন, তখন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম সরাসরি পরিদর্শন করেছিলেন।
সে কথা স্মরণ করে হিলারি ক্লিনটন অনুষ্ঠানে বলেন, “যেভাবে নারীরা আত্মনির্ভরশীল হয়েছে এবং নিজের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে তা অভূতপূর্ব। নিজের কাজকে বাংলাদেশের নারীদের বাইরে নিয়ে গেছেন অধ্যাপক ইউনূস এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন।”
ইউনূস বলেন, “গ্রামীণ ব্যাংকের পঞ্চাশ বছর উদযাপনের এই সময়ে মিলেছে এই স্বীকৃতি। এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ‘গ্রামীণ পরিবারে’ ব্যাপক উৎসাহব্যাঞ্জক বার্তা যাবে।”
ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের নিজেদের ‘জীবন গড়ার’ কথা তুলে ধরে হিলারি বলেন, “এখন লাজুক, নিশ্চুপ ও দরিদ্র নারী আপনি দেখবেন না। আত্মবিশ্বাস নারীদের আপনি দেখবেন, যারা নিজেদের সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা নিজেরাই বলেন।
“তাদের কথার গুরুত্ব থাকে। কেননা, তারা নিজেদের ব্যাংক পরিচালনা করেন। তারা গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক।”
পরবর্তী প্রজন্মকে চাকরি খোঁজার বদলে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রস্তুত হওয়ার তাগিদ দিয়ে ইউনূস বলেন, “আমরা চাকরি প্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।”
‘শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তোলার জন্য’ গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে ইউনূস বলেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সৃজনশীল ও উদ্যোক্তা মনোভাবাপন্ন হিসাবে গড়া।”
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট এদুয়ার্দো এম পেনিয়েলভার, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক ইউনূসের মেয়ে, অপেরা শিল্পী মনিকা ইউনূসের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পুরস্কারের বিতরণী অনুষ্ঠান শেষ হয়।
Posted ৩:০৩ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
nyvoice24 | New York Voice 24